গত বছর ঈদুল আজহার দিনে তিন মণ ওজনের গরু কোরবানি দিয়েছিলেন। আত্মীয়–স্বজনেরা বাড়িতে এসে চালের রুটির সঙ্গে গরুর মাংস খেয়েছেন পেটভরে। ছেলেমেয়েরা মংডু শহরে গিয়ে চার চাকার রিকশায় চড়েছে। আর এখন সেসব স্মৃতি। আজ ঈদের দিনে আশ্রয়ের আশায় টেকনাফের পথে পথে ঘুরতে হচ্ছে। সকালে ছেলেমেয়েরা কলা আর বিস্কুট খেয়েছে। দুপুরে মুখে দেওয়ার মতো কিছুই নেই। মিয়ানমারের সেনারা ঈদের আনন্দ মাটি করে দিয়েছে। আজ শনিবার সকাল সাতটার দিকে টেকনাফের ডেইলপাড়া গ্রামে কথাগুলো বললেন সেতারা বেগম (৪৫)। তাঁর বাড়ি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সিকদারপাড়ায়। আগের দিন শুক্রবার রাতে তিনি পরিবারের চার সদস্য নিয়ে শাহপরীর দ্বীপ ওঠেন। সেখান থেকে রিকশায় যান টেকনাফ। তারপর হেঁটে হেঁটে এই ডেইলপাড়ায়। দুরবস্থার কথা শুনে লোকজন তাঁকে কিছু অর্থ সহায়তাও দেন। সেতারা বেগম বলেন, তাঁরা আরাকানের মুসলমান। এখন যেটাকে ‘রাখাইন রাজ্য’ বলা হচ্ছে, সেটি আসলে ‘আরাকান রাজ্য’। সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার হয়ে আরাকানের মুসলমানদের জন্মভূমি ছাড়তে হচ্ছে। আর ‘রোহিঙ্গা’ বলে হেয় করা হচ্ছে। সব জায়গাতেই তাঁরা পরিস্থিতির ‘শিকার’ বলে দাবি তাঁর। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ঢুকতে এখন রোহিঙ্গাদের কেউ বাধা দিচ্ছে না। যানবাহনে চড়ে এদিক-সেদিক যেতেও সমস্যা হচ্ছে না। সমস্যা শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই ও খাওয়াদাওয়া। টেকনাফের পথে পথে এখন রোহিঙ্গা আর রোহিঙ্গা। শাহপরীর দ্বীপ-টেকনাফ সড়কে লাইন ধরে হাঁটছেন রোহিঙ্গারা। কেউ যাচ্ছেন উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরের দিকে। কেউ কেউ ঢুকে পড়ছে গ্রামে। তাঁরা আশ্রয় নিচ্ছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ঝোপজঙ্গলে। অসহায় বলে স্থানীয়রা রোহিঙ্গাদের প্রতিরোধ অথবা বাধা দিচ্ছেন না। আজ টেকনাফের প্রতিটা ঈদের জামাতে বিপদাপন্ন রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। নিন্দা জানানো হয় মিয়ানমার সরকারের কর্মকাণ্ডের প্রতি। সকালে শাহপরীর দ্বীপ সড়ক ও পাশের বেড়িবাঁধের কয়েকটি অংশে বসে ছিলেন কয়েক শ রোহিঙ্গা। তাঁরা আজ ভোরে নৌকায় এখানে পৌঁছেছে। কেউ কেউ অপেক্ষা করছেন আরও কিছু নৌকার জন্য। কিন্তু নৌকার দেখা মিলছে না। নৌকা আসতে যত দেরি হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক তত বাড়ছে। কারণ, নাফ নদীতে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে। ইতিমধ্যে ৫০ জন রোহিঙ্গার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ আছেন অনেকে। রোহিঙ্গাদের একজন সৈয়দ করিম (৫৫) বলেন, জীবনে এই প্রথম খোলা আকাশের নিচে কোরবানির ঈদ কাটাচ্ছেন। এবার ঈদের নামাজও পড়া হয়নি। ছেলেমেয়েরা ক্ষুধার জ্বালায় কান্নাকাটি করছে। বেড়িবাঁধের ওপর বসা রাখাইন রাজ্যের বুচিদং এলাকা থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা কামাল আহমদ (৪৫), মনিরা বেগম (৫০) ও রহিম উল্লাহ (৪৮) বলেন, গত কোরবানির ঈদে রাখাইন রাজ্যে ৩০টির বেশি রোহিঙ্গা–অধ্যুষিত গ্রামে কয়েক শ পশু জবাই হয়েছিল। এবার একটিও হয়নি। মিয়ানমারের সেনা ও পুলিশ রোহিঙ্গাদের গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছে। গৃহপালিত পশুসহ সব মালামাল লুট করেছে। রোহিঙ্গাদের কষ্টের ঈদ কাটছে বাংলাদেশের পথঘাটে। ২৪ আগস্ট রাখাইন রাজ্যের ২০টির বেশি সীমান্তচৌকিতে একযোগে হামলার ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করেছে সেখানকার সেনা ও পুলিশ। দমনপীড়নের মুখে আজ দুপুর পর্যন্ত বাংলাদেশ পালিয়ে এসেছে এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা। একই পরিস্থিতির শিকার হয়ে রাখাইন রাজ্য ছেড়েছেন সেখানকার ৪৯৫ জন হিন্দু। তাঁরা অবস্থান করছেন উখিয়ার একটি পরিত্যক্ত মুরগির খামারে। সম্প্রতি রাখাইন রাজ্য থেকে আসা রোহিঙ্গাদের ঈদ কাটছে চরম কষ্টে। পলিথিন ও গাছের লতাপাতা দিয়ে তৈরি ঝুপড়িঘরে ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে তাঁদের কাটাতে হচ্ছে গৃহবন্দী অমানবিক জীবন। দুপুরে টেকনাফ পৌরসভার পুরাতন বাসস্ট্যান্ডের আল জামেয়া মার্কেটে দুই শিশু সন্তান নিয়ে বসে ছিলেন আকলিমা খাতুন (৪০) নামের এক রোহিঙ্গা। একটু দূরে অবস্থান করছে আরও ৫০ জনের রোহিঙ্গা দল। দলের অধিকাংশ সদস্য নারী ও শিশু। উখিয়ার বালুখালী ও কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে যাওয়ার জন্য তাঁরা বাসের অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু ঈদের দিন বলে চালকেরা কেউ গাড়ি চালাচ্ছেন না। আকলিমা খাতুন বলেন, ৩০ আগস্ট বিকেলে রাখাইন রাজ্যের সিকদারপাড়াটি ঘিরে ফেলে সেনা ও পুলিশের কয়েক শ সদস্য। এরপর বেপরোয়া গুলিবর্ষণ শুরু করে। রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ চলে। প্রাণভয়ে লোকজন দিগ্‌বিদিক ছুটতে থাকেন। এ সময় মাথায় গুলি লেগে তাঁর স্বামী দিল মোহাম্মদের মৃত্যু হয়। এক ছেলে বেলাল (১৬) পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। ওই রাতেই তিনি ছেলেমেয়েদের নিয়ে টেকনাফ পালিয়ে আসেন। বেলালকে চিকিৎসার জন্য আগে পাঠানো হয়েছে কক্সবাজার। আকলিমার আকুতি—শুধু একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই।
Axact

Axact

Vestibulum bibendum felis sit amet dolor auctor molestie. In dignissim eget nibh id dapibus. Fusce et suscipit orci. Aliquam sit amet urna lorem. Duis eu imperdiet nunc, non imperdiet libero.

Post A Comment:

0 comments: