মায়ের এক ধার দুধের দাম,কাটিয়া গায়ের চাম,পাপস বানাইলেও ঋণ শোধ হবে না

অথচ শতবর্ষী অসুস্থ এক গর্ভধারিণীর ঋণ তার ছেলে ও ছেলে-বৌ শোধ করছে তাকে ভাঙা গোয়াল ঘরে গরু-ছাগলের সঙ্গে রেখে। গবাদি পশুর জন্য মশারি জুটলেও জোটেনি মায়ের ভাগ্যে। আর সেখানে শিয়াল কামড়ে খেয়েছে পায়ের মাংস। বৃদ্ধার আর্তচিৎকারে প্রতিবেশীরা এসে শিয়াল তাড়ালেও ছেলে ও ছেলে-বৌয়ের তাতে বয়েই গেছে। আর চিকিৎসা তো দূর অস্ত!

যে মা ১০ মাস সন্তানকে গর্ভে ধরেছেন, স্তন্য পান করিয়ে বড় করেছেন, সন্তানের সুখের জন্য নিজের সব সুখ বিসর্জন দিয়েছেন- তার এমন দুর্দশার এ চিত্র ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের তেজপাটুলি গ্রামের। আর ওই হতভাগ্যের নাম মরিয়ম নেছা।

মরিয়ম নেছা ৫ সন্তানের জননী। ১৯৭৫ সালে মারা যান তার স্বামী মোসলেম উদ্দিন। মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে বড় ছেলেকে মেট্রিক পাস করান। বড় ও মেঝ ছেলে বিয়ে করার পর মাকে রেখে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে চলে যান অন্যখানে। ততদিনে অনেকটাই ভেঙে পড়ে শরীর। স্বামীর ভিটায় নিজের বসতঘর না থাকায় ছোট ছেলের ঘরের বারান্দায় থেকে ভিক্ষাবৃত্তি করে অর্ধাহারে-অনাহারে দিনাতিপাত করতে থাকেন। বয়স শতবর্ষ ছুঁই ছুঁই (৯৮) হলেও মরিয়ম নেছার কপালে জুটেনি বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা বা সরকারি কোনো সুবিধা। বয়সের ভারে দেড় বছর ধরে আর ভিক্ষা করতেও পারেন না। সন্তানরাও তেমন খোঁজ নেয় না। আশপাশের মানুষের কাছ থেকে চেয়ে খেয়ে কোনোমতে দিন কাটছিল তার।

কয়েক মাস আগে বৃদ্ধ মায়ের খাবারের দায়িত্ব নেয় তিন সন্তান। কথা হয়- প্রত্যেকের বাড়িতে মা তিন মাস করে খাবেন। বড় ছেলে মোখলেছ থাকেন বেড়িবাড়ি গ্রামে, মেঝ ছেলে মোবারক হোসেন থাকেন মুক্তাগাছা উপজেলার কাঠবল্লা গ্রামে, ছোট ছেলে মারফত আলী থাকেন তেজপাটুলিতে।

আড়াই মাস রাখার পর মরিয়মকে মেঝ ছেলের বাড়িতে রেখে আসে মোখলেছ। মেঝ ছেলে ৩ দিন পর কাউকে না বলে তাকে রেখে যায় ছোট ছেলের বাড়িতে। মরিয়ম নেছার ঠাঁই হয় খালি বারান্দায়। অসুস্থ ও বয়সের ভারে প্রকৃতির কাজ সেরে ফেলেন সেখানেই। এতে ক্ষুব্ধ হন ছেলে ও ছেলে-বৌ। মাকে রেখে আসেন ভাঙা গোয়াল ঘরের এক পাশে। পাশেই গরু-ছাগল থাকে মশারির ভেতরে। মা উদাম। আর তার বিছানা বলতে প্লাস্টিকের বস্তা ও ছেঁড়া কাথা!

এলাকাবাসী জানায়, বুধবার গভীর রাতে সেখানে মরিয়ম নেছাকে কামড় দেয় শিয়ালে। কিন্তু তার কান্নায় ঘর থেকে কেউ বেরিয়ে আসেনি। একই রাতে দ্বিতীয়বার যখন শেয়াল আক্রমণ করে তখন বৃদ্ধার চিৎকারে আশপাশের বাড়ি থেকে মানুষ উঠে এসে তাকে শেয়ালের হাত থেকে বাঁচায়। ততক্ষণে শিয়াল তার পায়ের মাংস অনেকটা কামড়ে নেয়।

শনিবার বিকালে ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, অসুস্থ মরিয়ম নেছা বাড়ির দক্ষিণ পাশে একটি গোয়াল ঘরে অর্ধেক মাটি ও অর্ধেক ছেঁড়া প্লাস্টিকের বস্তায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন। মশা-মাছি ভন ভন করছে। গরুর মলমূত্রের ব্যাপক দুর্গন্ধ। কেউ নেই তার পাশে। শিয়ালের কামড়ে ক্ষত হওয়া স্থানে মাছির উপদ্রব। উল্টো দিকে রাখা আছে গরুর জন্য মশারি!

মরিয়ম নেছা বলেন, ছেলের ঘরের বারান্দায় থাকতাম। বারান্দায় বিছনায় প্রস্রাব পায়খানা করায় এখন থাকতে হচ্ছে গরুর সঙ্গে গোয়াল ঘরে। বুধবার রাতে দু’বার কামড় দেয় শিয়ালে। পায়ের মাংস তুলে নিয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, ‘ছেলেদের বহু বলেছি, বাজান আমারে ভালা কইরা চিকিৎসা করাও, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু ওদের মন গলছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছোট ছেলে মারফত আলী বলেন, শুক্রবার কাজ (দিনমুজরি) করে আসছি পশ্চিম থেকে। টাকার জন্য চিকিৎসা করাতে পারছি না। মাকে গোয়ালঘরে কেন রেখেছেন? জবাবে মারফত বলেন, ঘরের বারান্দায় প্র্রস্রাব-পায়খানা করার কারণে ২/৩ দিন ধরে নিজেই গোয়াল ঘরে চলে যান তিনি। প্রতিবেশী নিয়ামত আলী বলেন, শিয়াল কামড় দেয়ার তিন দিন হলেও এখন পর্যন্ত কোনো চিকিৎসা দেয়া হয়নি।

ঠিকমতো খাবার দেয়া হয় না মহিলাটাকে। শিয়ালের কামড়ের কথা শুনে ফুলবাড়ীয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. হারুন আল মাকসুদ বলেন, বৃদ্ধ ওই নারীকে দ্রুত চিকিৎসা করানো না হলে জলাতঙ্ক হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এছাড়া কামড়ের ক্ষত থেকে বড় ধরনের সংক্রমণও হতে পারে।

Axact

Axact

Vestibulum bibendum felis sit amet dolor auctor molestie. In dignissim eget nibh id dapibus. Fusce et suscipit orci. Aliquam sit amet urna lorem. Duis eu imperdiet nunc, non imperdiet libero.

Post A Comment:

0 comments: